রাজধানীর দক্ষিণখানে মনির হোসেন (৩০) নামের এক তরুণ খুন হওয়ার ৯ দিন পর হত্যারহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া দুই তরুণের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, সমকামিতায় জোর করায় ক্ষুব্ধ হয়ে মনির হোসেনকে খুন করেছে মেহেদী হাসান (২৪) ও আকিকুল (২২) নামের দুই তরুণ। এ ব্যাপারে মঙ্গলবার (৮ মে) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে তারা।

আরো পড়ুন

Error: No articles to display

পুলিশ আরও জানায়, ২৮ এপ্রিল দক্ষিণখান থানার দেওয়ানবাড়ি এলাকার নিজের বাসায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনিরকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যাকার‌ী ধরতে অভিযানের এক পর্যায়ে সোমবার (৭ মে) ময়মনসিংহের ফুলপুর থেকে মেহেদী হাসান ও আকিকুলকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মহরম আলী বলেন, ’এটি একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড ছিল। প্রথমে আমরা ধারণা করেছিলাম ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রযুক্তির সহায়তায় মেহেদী ও আকিুকলকে শনাক্ত করার পর তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।’
হত্যার ঘটনার ব্যাপারে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ’দক্ষিণখানের দেওয়ানবাড়ি এলাকার ১৪৩ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় থাকতো মনির হোসেন। সে জায়গা-জমির ব্যবসার পাশাপাশি উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রি করতো। এছাড়া সে সুদের ব্যবসাও করতো। গত ২৮ এপ্রিল অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। খবর পেয়ে উলঙ্গ অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় থানা পুলিশ।’
এ ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত সম্পর্কে ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ’প্রথম দিকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ওই বাসার (মনির যে বাসায় থাকতো) দারোয়ান জসিম উদ্দিন বাবুকে সন্দেহ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে আনা হলে একটু চাপ দিতেই সে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। জসিম জানায়- সে, বাচ্চু ও ইলিয়াস তিনজন মিলে মনিরকে হত্যা করে। কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জসিমের এই স্বীকারোক্তির সঙ্গে বস্তুগত এভিডেন্স মেলাতে গেলে রহস্যের সৃষ্টি হয়। জসিম তার সহযোগী দুইজনের যোগাযোগের ঠিকানা ও হত্যাকাণ্ডের অন্যান্য উপাত্ত প্রসঙ্গে অসংলগ্ন কথা বলতে থাকে। পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই মনিরের সঙ্গে যোগাযোগ হতো এমন দুটি মোবাইল নম্বর একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়।’
অধিকতর তদন্তের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, ’প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, বন্ধ হওয়া মোবাইল দু’টি মেহেদী হাসান ও আকিকুল নামে দুই তরুণ ব্যবহার করতো। তারা দক্ষিণখান এলাকায় রঙ-মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতো। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর তারা দু’জনই একসঙ্গে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। গত সোমবার পুলিশ মেহেদী ও আকিকুল ইসলামকে শনাক্তের পর ময়মনসিংহের ফুলপুর ও হালুয়াঘাট এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে মনিরের ব্যবহৃত সিম্ফোনি মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।’
গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আমিরুল হায়দার চৌধুরীর কাছে মেহেদী ও আকিকুল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলেও পুলিশ জানায়।
জবানবন্দিতে মেহেদী যা বলেছে সে ব্যাপারে পুলিশ জানায়, ’জবানবন্দিতে মেহেদী বলে- আমি দক্ষিণখান এলাকার নকশি ফার্নিচারে কাজ করি। স্থানীয় রুহুল আমীনের মাধ্যমে মনিরের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। মনির তার বাসায় যাতায়াতের পথে আমার দোকানে আসতো। গত ২৮ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে আমার দোকানে এসে তার বাসার দরজার পাল্লায় রঙ লাগানোর কথা বলে বাসায় যেতে বলে। বিকালে না গিয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমি ও আকিকুল ওই বাসায় যাই। মনির তার বাসায় যাওয়ার পর প্রথমে আমাদের দু’জনের হাতে ১০০ টাকা করে দিয়ে ঘরে বসতে বলে। ঘরের লাইট বন্ধ ছিল। মনির আমাদের বসতে বলে হাতে একটা মোবাইল দিয়ে সেখানে অশ্লীল ভিডিও দেখতে বলে। এরপর সে বাথরুমে যায়।’ প্রায় ২০ মিনিট পর বাথরুম থেকে বের হয়ে মনির ওই দুই তরুণকে সমকামিতার প্রস্তাব দেয় বলেও মেহেদী জবানবন্দিতে বলেছে বলে পুলিশ জানায়।
এ ব্যাপারে পুলিশ আরও জানায়- ’মেহেদী আরও বলেছে- আমরা তার (মনিরের) আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় সে আমাদের আরও টাকা দিতে চায় এবং পরে তার সঙ্গে খারাপ কাজ না করলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এসময় আমরা ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে সে জোর করে আটকে রাখার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে আকিকুল ক্ষিপ্ত হয়ে মনিরকে ধাক্কা দিলে সে নিচে পড়ে যায়। পরে আমার প্যান্টের পকেটে থাকা নাইলনের রশি দিয়ে তার গলায় প্যাঁচ দিয়ে দুইজন দুই দিকে টানতে থাকি। মনিরের মুখ দিয়ে এসময় রক্ত বের হয়। এরপর তার মোবাইলটি হাতে নিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে আসি। ঘটনার পর দু’জনই দক্ষিণখান থেকে সোজা ময়মনিংহে গ্রামের বাড়ি চলে যাই।’
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর দু’জনই ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছিল। তারা দু’জনই ’ঢাকায় আর ভালো লাগে না, এজন্য কাজ ছেড়ে চলে গিয়েছে’ বলে পরিবারের সদস্যদের জানায়। তারা কাউকে হত্যা করতে পারে বলে পরিবারের সদস্যরাও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরো পড়ুন

Error: No articles to display