আমার মাম্মাকে মাউ কাম্মা দিয়েছে, মাম্মা প্লেন থেকে পড়ে গিয়েছে, মাম্মার অনেক ব্যথা!
আড়াই বছরও হয়নি হিয়ার বয়স, এখনই সে জানে তার মায়ের অনেক ব্যথা! তবে এই ব্যথা ভোগ করার জন্য পৃথিবীতে আর নেই তার মা শারমিন আক্তার নাবিলা। বাড়িতে ডাকা হতো নিশাত নামে। গত ১২ মার্চ নেপালে দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হওয়া প্লেনের কেবিন ক্রু ছিলেন তিনি

দুর্ঘটনার পর থেকেই মায়ের সঙ্গে হিয়াও আছে সংবাদের শিরোনামে। কথা হয় হিয়ার বাবা ইমাম হাসানের সঙ্গে। প্রেমের বিয়ে ছিল তাদের। নাবিলার সঙ্গে পরিচয় বাণিজ্য মেলায়। একটা স্টলে কাজ করেছিল হাসান। নাবিলা গিয়েছিল তার এক নানার সঙ্গে।
হাসান, তার বন্ধু-বান্ধব, বাড়ির লোকজন, প্রতিবেশী, সবার একই কথা- নাবিলা খুব দুঃখী মেয়ে ছিল! নাবিলা বড় ভালো মেয়ে ছিল!
ছোটবেলা থেকে যুদ্ধ করে বড় হওয়া মেয়ে নাবিলা। বাবা মরে গেছে বহু আগে। এরপর দায়িত্ব নেন দাদু। আর্থ-সামাজিক অবস্থান বাধা হতে পারেনি নাবিলা-হাসানের মধ্যে। হয়তো একটা পরিবারই শুধু চেয়েছিলেন তিনি

হিয়ার বয়স তখন ছয় মাস। যুদ্ধে টিকে থাকতে আকাশে উড়াল দেওয়া যাত্রীদের সেবা দেওয়ার প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন নাবিলা। সে প্রসঙ্গে কথা হয় নাবিলার নানী মিনুর সঙ্গে। নাবিলার মায়ের খালা তিনি। খুব আফসোস করে বলেন, মেয়েটা খুব মেধাবী ছিল। শ্বশুরবাড়িতে হয়তো ভালোই ছিল। কখনও ওকে বলতে শুনিনি এখানে কেউ অযত্ন করে।
হিয়ার যত্ন নেন তার ফুপু ফাতেমা। পুংখানুপুংখভাবে জানেন কিসের পরে কী লাগবে হিয়ার। তিনিই সব গুছিয়ে রওয়ানা হন আর্মি স্টেডিয়ামে নাবিলার মরদেহ আনতে।
সন্ধ্যা নামলে ফিরে আসেন ইমাম হাসান ও তার পরিবার, সঙ্গে বাক্সবন্দি নাবিলার শব। বাক্স খোলার উপায় নেই। বাড়ির লোকেদের মধ্যে দীর্ঘ ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাস। হিয়া জানে না ওই বাক্সটায় তার মা অথবা মায়ের ঝলসে যাওয়া দেহাবশেষ। সে তখনও প্লেন গুণছে, কোন প্লেনে আছে তার মা? কখন আসবে?
নেপাল থেকে নাবিলাকে নিয়ে এসেছে নাবিলার ভাসুর বেলাল আহমেদ বাবলু। হিয়া যেন প্রাণ ফিরে পেল চাচাকে পেয়ে। চাচাকে সে ডাকে বাবা বলে। বাবাকে এখন আর গোসলেও যেতে দেবে না। বাবার কোলেই থাকবে। বাবা যেই না বললেন, হাসো! ওমনি মুখ ভরে হাসি চলে এলো মেয়ের। এই জ্বালা ধরা কঠিন, জীবনে বাবাই যে তার একমাত্র বেঁচে থাকার সম্বল তা বুঝে গেছে ছোট্ট মেয়েটিও। লতানো গাছের মতো তাই আঁকড়ে ধরে আছে \\\’বাবা\\\’কে।
হিয়া, অবিকল মাতৃমুখের মেয়েটির ভাগ্যটিও হলো মায়ের মতো। এখন মায়ের মতো দাদীর কাছেই বড় হতে হবে তাকে। মা হয়তো তার জন্য হবে একটা ছবি অথবা বুকের ভেতর এক বিশাল শূন্যস্থান।
সারাবাংলা