পেনাল কোডে থাকা সরল বিশ্বাসে করা কাজ আর তার জন্য দায়মুক্তি ২০০ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের রক্ষাকবচ৷ তবে এটি আজকের যুগে মূল্যহীন আর পরিত্যক্ত৷ খোদ ইংল্যান্ডেই এটি তুলে দেওয়া হয়েছে মোটামুটি৷ ডিসি সম্মেলন থেকে বেরিয়ে দুদক চেয়ারম্যানের এ প্রসঙ্গের উল্লেখ অবশ্যই বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে৷
দুদক চেয়ারম্যানের বলা ’সরল বিশ্বাস’ এবং পেনাল কোড নিয়ে কাল সারাদিন আলোচনা হয়েছে৷ সামাজিক মাধ্যমের পেন্ডুলাম নীতি অনুসারে যথারীতি প্রথমে জনাব মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঢেউ বয়ে চলে, আর এর পর আসে ’সাংবাদিক বুঝে না’ বাতাস৷

কেউ আমাকে একটি উদাহরণ দেখাতে পারবেন, যেখানে পেনাল কোডের বয়ান অনুসারে কোনো সরকারি কর্মকর্তা কোনোদিন সরল বিশ্বাসে কাজ করে অভিযুক্ত হয়েছেন? সরকারি কর্তারা এখন প্রচুর সেফগার্ড ব্যবহার করেন, দেশি বিদেশি ট্রেনিং করেন, ওয়েল ইনফর্মড থাকেন, তাই সরল বিশ্বাসে ভুলের সুযোগ এখন আর নেই৷

সরকারি কর্তারা সিদ্ধান্ত নেন প্রচুর, তাই তাঁরা ভুলও করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগও ওঠে অনেক৷ কিন্তু আবারও বলি, সরল বিশ্বাসে ভুল এখনকার তাঁরা আর করেন না, মানে অনেকদিন ধরেই সেই লাক্সারি আর নেই৷

তবুও সরকারি কর্মকর্তারা সে প্রসঙ্গটি এনেছেন আর দুদক প্রধান সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন৷ যাতে আমি দুদক প্রধানের অসহায়ত্ব দেখছি৷

একটু বুঝিয়ে বলি, দুদকের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্ব শুরু থেকেই রয়েছে, থাকারও কথা৷ কিন্তু ডিসি সম্মেলন থেকে বেরিয়ে ইকবাল মাহমুদের পেনাল কোডের সরল পাঠে আমরা বুঝি সরকারি কর্মকর্তাদের ধরার সাধ্য দুদকের আর নেই৷ মানে শীর্ষ কর্মকর্তা বা সচিবদের বাদ দিলাম, মাঝারি অর্থাৎ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এখন চেয়ারম্যানকে পেনাল কোড ইত্যাদি পড়াচ্ছেন৷

আরেকটু মনে হয় বলা উচিত, ডিসি সাহেবরা বা জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেন না, নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন৷ হাতকড়া পরা টিএনওর ছবি মনে পড়ে? কিংবা আড়ং বন্ধ করে দেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট? দুই ক্ষেত্রেই খোদ প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত দিতে হয়েছিল৷ তো সরল বিশ্বাসে সরকারি কর্তারা কাজ করেন কখন? কোথায়? পেনাল কোডের আইন সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও বারবার সরকারি কর্মকর্তার কথা আসছে, কারণ দুদকের আওতা সরকারিদের দুর্নীতি পর্যন্তই৷

মনে করা যেতে পারে, ডিআইজি মিজান নিজে গণমাধ্যমে ঘুস দেওয়ার কথা বলেছেন তাই তাকে কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে৷ দুদকের এইখানে কোনো ভূমিকা নেই৷

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব আইনেই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে বা ভুল করে কোনো অপরাধ আর স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে করা ভুলের শাস্তির মধ্যে তফাত রয়েছে৷ এর জন্য আলাদা করে ’সরল বিশ্বাস’ নামক তাবিজ আমদানির দরকার নেই, মাননীয় দুদক চেয়ারম্যান আর ডিসি সাহেবরা তা ভালোই জানেন৷

সরকারি কর্মকর্তারা যদি উপরওয়ালার নির্দেশের ডাক নাম সরল বিশ্বাস দিতে চান আমার কিছু বলার নেই৷ আরেকটি কথা, সরকারিরা অনেক প্রতিযোগিতা দিয়ে চাকরিতে আসেন, টিকে থাকেন; আমার আশা- বিশ্বাস বা সরল বিশ্বাস নয়, তাঁরা স্বচ্ছতার সঙ্গে যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে কাজ করবেন৷

লেখক: খালেদ মুহিউদ্দীন, ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান