ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআই বিশ্বের সর্বত্র পরিচিত একটি অ-লাভজনক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক উন্নয়নে বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত দূর্নীতি পর্যবেক্ষণপূর্বক সাধারণের কাছে তুলে ধরাই এর মূল লক্ষ্য।টিআই কোনরূপ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দূর্নীতি কিংবা ব্যক্তিগত দূর্নীতি তদন্তের জন্য দায়বদ্ধ নয়। এটি দূর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে এবং সামাজিক সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সাথে কাজ করে সচেতন করছে। টিআইয়ের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে - দূর্নীতির বিরুদ্ধে এর অবিচ্ছেদ্য এবং সংঘর্ষপূর্ণ অবস্থান করা।সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।একজন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করতে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয় বলে জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ ছাড়া ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা পেতে ৫০০ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বলেও টিআইবির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।
এতে বলা হয়েছে, জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে সেবা পেতে প্রতিটি পদক্ষেপে সেবাগ্রহীতাদের ৫০০ থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভূমির দলিল ও নিবন্ধন সেবাখাতে ব্যাপক সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। এ খাতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। সেবাখাত মানেই সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতিপ্রবণ। দলিল নিবন্ধন আর দুর্নীতি যেন অনেকটা সমার্থক হয়ে গেছে। এই খাতে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের চিত্র বিরাজ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত আছে যে, একজন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করতে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়েছে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, কোনো কোনো ভূমি দলিল নিবন্ধন অফিস ব্যতিক্রমও পেয়েছি। অনেক কর্মকর্তা জবাবদিহিতার সঙ্গে স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সে সংখ্যা তুলনায় খুবই কম।

ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবাখাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে দুটি জিনিসকে গুরুত্ব দেয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। দুর্নীতির অংশীজনদের নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করা, দুর্নীতিপরায়ণদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে সেবাগ্রহীতারা হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন, সরকারের রাজস্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

দ্বিতীয়ত প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি ও আধুনিকায়নকে গুরুত্ব দেয়া। যদিও সরকার এই কার্যক্রম গ্রহণ করলেও অগ্রগতি নেই। এ ক্ষেত্রে ই-নিবন্ধনসহ পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। এটা সম্ভব হলে এই খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম কমে আসবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সুলতানা কামাল, উপদেষ্টা (নির্বাহী) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। গবেষণা পরিচালনা ও প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রোগ্রাম ডেপুটি ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) শাম্মী লায়লা ইসলাম ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) নিহার রঞ্জন রায়।

প্রতি‌বেদ‌নে উঠে আসে, মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী বিভাগীয় কোটায় ৫ শতাংশ, প্রধান অফিস সহকারী থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। মুজিবনগর সরকার কর্মচারী নিয়োগে ১৯৭ জন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের একাংশের বয়স ১৯৭১ সালে ১৮ বছরের কম ছিল। বিভাগীয় প্রধান অফিস সহকারী থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন তাদের একাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসএসসি পাশ ব্যক্তিও রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি লাভ করেছেন। নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ লাখ থে‌কে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। তবে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়ার পর থেকে লেনদেনের মাত্রা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন একজন সাব রেজিস্ট্রার।

অন্যদিকে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলির জন্য নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন ও প্রভাব বিস্তার বা তদবির করা হয়। বিশেষ করে পছন্দনীয় স্থানে বদলির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। নিবন্ধন সেবাও দুর্নীতিপ্রবণ হওয়ায় সাব রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে বদলির বিষয় এবং এক্ষেত্রে লেনদেনের পরিমাণ আরো অনেক বেশি। তা‌দের বদ‌লির ক্ষে‌ত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা দি‌তে হয়। এলাকাভেদে নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের পরিমাণ কম-বেশি হয়। ঢাকার আশপাশের এলাকার জন্য ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন হয়েছে। আবার সাব-রেজিস্ট্রার থেকে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন রয়েছে। নকল নবিশ পদে তালিকাভুক্তি এবং অস্থায়ী কর্মচারী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়মবহির্ভূত দিতে হয়। নকল নবিশদের তালিকাভুক্তির কাজে যোগদানের জন্য ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
ভূমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দূর করতে টিআইবির পক্ষ থেকে ১৫ দফা সুপারিশও করা হয়েছে।